বিসিএস লিখিত পরীক্ষা গাইডলাইন:

আপনার পছন্দের সহজ বিষয়টি পড়া শুরু করুন

,. লিখেছেন > সুশান্ত পাল , সম্মিলিত মেধায় ১ম ,৩০তম বিসিএস ।

. .

ধরেই নিলাম, ৩৬তম বিসিএসে আপনি চাকরিটা পাবেন, এর সম্ভাবনা মাত্র ১ শতাংশ। পরীক্ষা তো দেবেনই, নাকি? পরীক্ষা যদি দিতেই হয়, তবে পড়াশোনা না করে দিয়ে কী লাভ? দায়িত্ব নিয়ে বলছি, প্রতিটি বিসিএসে মাত্র ১ শতাংশ সম্ভাবনায় ৭০ শতাংশ লোক চাকরি পান। ওঁরা যদি পান, তবে আপনি কেন পাবেন না? শত ভাগ এফর্ট দিয়ে পড়াশোনা শুরু করে দিন, এই মুহূর্ত থেকেই!

.

আমার নিজের মতো করে কিছু পরামর্শ দিচ্ছি। এগুলো আপনার মতো করে কাজে লাগাবেন।

১. নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া বাসা থেকে বের হওয়া একেবারেই বন্ধ করে দিন।

২. প্রতিদিন পড়াশোনা করুন অন্তত ১৬ ঘণ্টা; চাকরিটা ছাড়া সম্ভব না হলে অন্তত সাত ঘণ্টা। এ সময়টাতে পাঁচ ঘণ্টার বেশি ঘুম একধরনের বিলাসিতা। বিশ্বাস করে নিন, আপনি আপনার প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে যত মিনিট কম ঘুমাবেন, ওনার তুলনায় আপনার চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি।

৩. একটা বিষয় পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে পড়লে আপনার পছন্দের সহজ বিষয়টি পড়া শুরু করুন।

৪. ফোন রিসিভ করা, ফেসবুকিং, সামাজিকতা কমিয়ে দিন। পড়ার টেবিল থেকে মুঠোফোনটি দূরে রাখুন।

৫. অনুবাদ, অঙ্ক, ব্যাকরণ, মানসিক দক্ষতা প্রতিদিনই চর্চা করুন।

৬. অমুক তারিখের মধ্যে অমুক সাবজেক্ট বা টপিক, যত কষ্টই হোক, শেষ করে ফেলব—এই টার্গেট নিয়ে পড়ুন।

৭. পড়ার সময় লিখে পড়ার তেমন প্রয়োজন নেই; বরং বারবার পড়ুন। প্রশ্ন অত কমন আসবে না, আপনাকে এমনিতেই বানিয়ে বানিয়ে লিখতে হবে।

৮. নম্বর ও প্রশ্নের গুরুত্ব অনুসারে কোন প্রশ্নে কত সময় দেবেন, এটা অবশ্যই ঠিক করে নেবেন।

৯. সব সাজেশন দেখবেন, কিন্তু কোনোটাই ফলো করবেন না। আগের বছরের প্রশ্ন আর কয়েকটা সাজেশন ঘেঁটে নিজের সাজেশন নিজেই বানান।

১০. রেফারেন্স বই কম পড়ে গাইডবই বেশি পড়ুন। পাঁচটি রেফারেন্স বই পড়ার চেয়ে একটি নতুন গাইডবই উল্টেপাল্টে দেখা ভালো।

১১. লিখিত পরীক্ষায় আপনাকে উদ্ধৃতি আর তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রাসঙ্গিকভাবে প্রচুর লিখতে হবে। বাংলায় গড়ে প্রতি তিন মিনিটে এক পৃষ্ঠা, ইংরেজিতে গড়ে প্রতি পাঁচ মিনিটে এক পৃষ্ঠা—এই নীতি অনুসরণ করতে পারেন।

১২. যে ভাষায় আপনি অতি দ্রুত লিখতে পারেন, সেই ভাষাতে উত্তর করবেন। আমি উত্তর করেছিলাম বাংলায়।

১৩. প্রতিদিনই প্রার্থনা করুন, সবার সঙ্গে বিনীত আচরণ করুন। এটা আপনাকে ভালো প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করবে।

১৪. যেগুলো কিছুতেই মনে থাকে না, সেগুলো মনে রাখার অতি চেষ্টা বাদ দিন। অন্য কেউ ওটা পারে মানেই আপনাকেও পারতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। আপনি যা পারেন, তা যেন ভালোভাবে পারেন, সেদিকে খেয়াল রাখুন।

১৫. সবকিছু পড়ার সহজাত লোভ সামলান। বেশি পড়া নয়, প্রয়োজনীয় টপিক বেশি পড়াই বড় কথা।

১৬. কারও পড়ার স্টাইল অন্ধভাবে ফলো করবেন না। ফলাফলই বলে দেবে, কে ঠিক ছিল, কে ভুল। ফল বের হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আপনি কারও চেয়ে কোনো অংশে কম নন।

১৭. অন্তত তিন-চারটি গাইডবই থেকে উত্তর পড়ুন। পড়ার সময় গোলমেলে আর দরকারি অংশগুলো দাগিয়ে রাখুন, যাতে রিভিশন দেওয়ার সময় শুধু দাগানো অংশগুলো পড়লেই চলে।

১৮. দিনের বিভিন্ন সময়ে ব্রেক নিয়ে ১০-১৫ মিনিট করে অল্প সময়ের জন্য ঘুমিয়ে নিলে দুটো লাভ হয়। এক. রাতে কম ঘুমালে চলে। দুই. যতক্ষণ জেগে আছেন, সে সময়টার সর্বোত্তম ব্যবহারটুকু করতে পারবেন। ও রকম অল্প সময়ের কার্যকর ঘুমকে ‘পাওয়ার ন্যাপ’ বলে।

১৯. অনলাইনে চার-পাঁচটি পেপার পড়ার সময় শুধু ওইটুকুই পড়ুন, যতটুকু বিসিএস পরীক্ষার জন্য কাজে লাগে।

২০. বিসিএস পরীক্ষা হলো লিখিত পরীক্ষার খেলা। বাংলা, ইংরেজি, গণিত, মানসিক দক্ষতা আর বিজ্ঞানে বেশি নম্বর তোলা মানেই অন্যদের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে যাওয়া। এই সময়ে বিসিএস পরীক্ষায় দুর্নীতি, ভাইভাতে স্বজনপ্রিয়তা, সিভিল সার্ভিসের নানান নেতিবাচক দিকসহ দুনিয়ার যাবতীয় ফালতু বিষয় নিয়ে শোনা, ভাবা, গবেষণা করা থেকে নিজেকে বিরত রাখুন।

এ কয় দিনে আপনার প্রচণ্ড মানসিক ও শারীরিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যাওয়ার কথা। ও রকমই হলে, আমি বলব, আপনি ঠিক পথে আছেন। আমার অভিজ্ঞতা বলে, পরীক্ষার আগের সময়টাতে যে যত বেশি আরামে থাকে, পরীক্ষার ফল বের হওয়ার পরের সময়টাতে সে ততোধিক কষ্টে থাকে। বেশি পরিশ্রমে কেউ মরে না। যদি তা-ই হতো, তবে আমরা দেখতে পেতাম, পৃথিবীর সব সফল মানুষই মৃত।

গণিত ও বিজ্ঞানে নির্ভর করছে অনেক কিছু বিসিএসে টেকা অনেকটাই নির্ভর করছে লিখিত পরীক্ষার ওপর। 

তিন পর্বের বিশেষ ধারাবাহিক আয়োজনে আজ গাণিতিক যুক্তি ও মানসিক দক্ষতা এবং সাধারণ বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি। লিখেছেন ৩০তম বিসিএসে প্রথম সুশান্ত পাল

..সৌজন্যে > কালের কণ্ঠt:

গলফ খেলায় ভালো খেলোয়াড়রা দুটি ব্যাপার মাথায় রাখেন—এক. বল। দুই. গর্তটা। গর্তে বলটা ফেলার জন্য গর্তের সঙ্গে বলটার সংযোগের একটা দৃঢ় কল্পনা মাথায় আসার পরেই তাঁরা বলে আঘাত করেন। আর সাধারণ মানের খেলোয়াড়রা দূরত্ব, আশপাশের মাঠের পরিবেশ, দর্শকদের প্রতিক্রিয়া—এসব নিয়েও ভাবতে থাকেন।

বিসিএস পরীক্ষার জন্য দুটি ব্যাপার মাথায় রাখুন—এক. প্রস্তুতি কৌশল। দুই. চাকরিটা। বিসিএস নিয়ে যত বেশি গবেষণা করবেন, ততই আপনার প্রস্তুতি খারাপ হবে। আপনার স্বপ্নটা মাথায় রেখে আর কোনো কিছুকেই তোয়াক্কা না করে প্রচুর পরিশ্রম করে প্রস্তুতি নিন। দেখবেন চূড়ান্ত গেজেটে আপনার রোল নম্বরটা আছে!

এই সময়টাতে আপনার মনোযোগ বিক্ষিপ্ত করে—এমন সব ব্যাপার জীবন থেকে সাময়িকভাবে একেবারেই সরিয়ে দিন। অনেক নির্বোধই নানা মন্তব্য করতে পছন্দ করে—এ রকম লোকজন থেকে নিজেকে দূরে রাখুন।

গাণিতিক যুক্তির জন্য যেকোনো তিনটি গাইড বই কিনে সলভ করে ফেলুন। ম্যাথস ভালো না পারলে প্রতিদিনই প্র্যাকটিস করুন। বিসিএস পরীক্ষায় ম্যাথসে ফুল মার্কস পাওয়ার জন্য সায়েন্সের স্টুডেন্ট হতে হয় না। প্রতিটি স্টেপ বিস্তারিতভাবে দেখিয়ে ম্যাথস করবেন। কোনো সাইড নোট, প্রাসঙ্গিক তথ্য—কিছুই যেন বাদ না যায়।

সরল : আগের বছরের প্রশ্ন, গাইড বই। সরলের উত্তর সবার শেষে করলে ভালো হয়।

বীজগাণিতিক রাশিমালা, বীজগাণিতিক সূত্রাবলি, উৎপাদকে বিশ্লেষণ, একমাত্রিক ও বহুমাত্রিক সমীকরণ, একমাত্রিক ও বহুমাত্রিক অসমতা, সমাধান নির্ণয়, পরিমিতি, ত্রিকোণমিতি : আগের বছরের প্রশ্ন, গাইড বই। চাইলে নবম-দশম শ্রেণির গণিতের সংশ্লিষ্ট অধ্যায় সলভ করে নিতে পারেন।

ঐকিক নিয়ম, গড়, শতকরা, সুদকষা, লসাগু, গসাগু, অনুপাত ও সমানুপাত, লাভক্ষতি, রেখা, কোণ, ত্রিভুজ, বৃত্তসংক্রান্ত উপপাদ্য, পিথাগোরাসের উপপাদ্য, অনুসিদ্ধান্ত : আগের বছরের প্রশ্ন, গাইড বই।

সূচক ও লগারিদম, সমান্তর ও জ্যামিতিক প্রগমন, সেটতত্ত্ব, ভেনচিত্র, সংখ্যাতত্ত্ব : গাইড বই ও নবম-দশম শ্রেণির গণিতের সংশ্লিষ্ট অধ্যায়।

বিন্যাস ও সমাবেশ, স্থানাংক জ্যামিতি : গাইড বই, একাদশ শ্রেণির বই থেকে সংশ্লিষ্ট অধ্যায়।

সম্ভাবনা : গাইড বই, দ্বাদশ শ্রেণির বিচ্ছিন্ন গণিতের সংশ্লিষ্ট অধ্যায়।

মানসিক দক্ষতার প্রশ্নগুলো একটু ঘোরানো হওয়ারই কথা। মাথা ঠাণ্ডা রেখে, ভালোভাবে প্রশ্ন পড়ে, এদিক ওদিক না তাকিয়ে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে উত্তর করতে হবে। চার-পাঁচটি গাইড বই ভালোভাবে পড়ে ফেলুন।

গাইড বই, আইকিউ টেস্টের বই, আর গুগলে সার্চ করে বিভিন্ন সাইটে ঢুকে এই অংশটি নিয়মিত প্র্যাকটিস করতে পারেন। এ অংশে ফুল মার্কস পাবেন না, এটা মাথায় রেখে প্রস্তুতি নিন।

সাধারণ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অংশের জন্য আগের বছরের প্রশ্নগুলো আর দুই-তিনটি গাইড বইয়ের সাজেশনসের প্রশ্নগুলো প্রথমেই যথেষ্ট সময় নিয়ে কয়েকবার খুব ভালোভাবে পড়ে ফেলুন। এই অংশে সাধারণত সায়েন্সের স্টুডেন্টরা মার্কস কম পায়। এর কারণ হলো, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের কারণে অনেকেই ঠিকভাবে প্রস্তুতি নেয় না। বিজ্ঞানে বানিয়ে বানিয়ে লিখুন কম। প্রয়োজনীয় চিহ্নিত চিত্র, সংকেত, সমীকরণ দিতে পারলে আপনার খাতাটা আর দশজনের চেয়ে আলাদা হবে। মাথায় রাখুন, ১০ মার্কসের একটি প্রশ্ন উত্তর করার চেয়ে ৪+৩+৩ = ১০ মার্কসের তিনটি প্রশ্নের উত্তর করা ভালো। এখন কোন অংশটি কোথা থেকে পড়তে পারেন, সেটা নিয়ে বলছি।

আলো, শব্দ, চৌম্বকবিদ্যা : গাইড বই, নবম-দশম শ্রেণির পদার্থবিজ্ঞান, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির পদার্থবিজ্ঞান প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র।

অম্ল, ক্ষারক, লবণ : নবম-দশম শ্রেণির সাধারণ বিজ্ঞান, একাদশ শ্রেণির রসায়ন।

পানি, আমাদের সম্পদসমূহ, পলিমার, বায়ুমণ্ডল, খাদ্য ও পুষ্টি, জৈবপ্রযুক্তি, রোগব্যাধি ও স্বাস্থ্যের যত্ন : গাইড বই, ইন্টারনেট, নবম-দশম শ্রেণির সাধারণ বিজ্ঞান, নবম-দশম শ্রেণির ভূগোল।

কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি : গাইড বই, ইন্টারনেট, পিটার নরটনের ইন্ট্রোডাকশন টু কম্পিউটারস, উচ্চ মাধ্যমিক কম্পিউটার শিক্ষা প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র।

ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক টেকনোলজি : গাইড বই+উচ্চ মাধ্যমিক পদার্থবিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র।

সিলেবাস দেখে টপিক ধরে ধরে কোনটা কোনটা দরকার, শুধু ওইটুকুই ওপরের বইগুলো থেকে পড়বেন (গাইডেও অনেক কিছু দেওয়া থাকে, যেগুলোর কোনো দরকারই নেই)। চাইলে বই না কিনে যতটুকু দরকার ততটুকু ফটোকপি করে নিতে পারেন। টপিকগুলোকে ইন্টারনেটে সার্চ করে পড়লে খুবই ভালো হয়। বেশি বেশি প্রশ্ন স্টাডি করে প্রশ্নের ধরন বোঝার চেষ্টা করুন, এতে অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন পড়ে সময় নষ্ট হবে না।

এই সময়টাতে এদিক-ওদিক না দৌড়ে, বাসায় বেশি সময় দিন। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রধান সমস্যাটাই হলো, প্রিপারেশন প্রিপারেশন ভাব, প্রিপারেশনের অভাব! বিসিএস লিখিত পরীক্ষা দেওয়া অত সোজা না। এটা ঠিক, এ পরীক্ষা দিয়ে পাস করে ফেলতে পারবেন। কারণ এ পরীক্ষায় ফেল করা আসলেই কঠিন। শুধু পাস করার সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে ভাইভা পরীক্ষা দিতে পারবেন, আর কিছু না। আপনার টার্গেট পাস করা নয়, চাকরি পাওয়ার মতো বেশি নম্বর পেয়ে পাস করা।

যদি ঠিকভাবে বুঝেশুনে পরিশ্রম করেন আর সেটাকে কাজে লাগাতে পারেন, তবে ভালোভাবে পাস করার যথার্থ পুরস্কার হিসেবে চাকরিটা পাবেন।